বৈশাখে তপ্ত গরমে স্কুলে ছুটি শুরু হয়েছেে। অনেক দিনের লম্বা ছুটি। মায়ের সঙ্গে মাসি বাড়ি যাবো। এই আনন্দে দুপুরে মায়ের হাতের মাছের ঝোল ভাত আর পাকা আম খেয়ে স্যান্ডো গেঞ্জি, পেপসি স্টিকার দেওয়া প্যান্ট পরে বিছানার এক পাশে শুয়ে আছি। বিকাল হয়ে আসছে মায়ের এক বান্ধবী বসে আছে বিছানায়। মা কে জিজ্ঞেস করলো কত রোল হল? মা বলল, সাত নম্বর রোল। পড়াশোনা দিন দিন খারাপ হচ্ছে, যত দোষ ওর বাবার। একটুও ভালোবাসে না। আমিও জেগে থেকেও চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলাম। আমাদের তখনো মাটির বাড়ি, বিছানার দিকের দেওয়াল ক্রমশ ফুলে আসছে। তখন বড়োরা আমায় জড়িয়ে ধরে চুমু খায়, কত আদর। আমিও মা বলতে অজ্ঞান হয়ে যেতাম। পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি যদি কাউকে বেশি ভালোবাসি, সে হল মা। বাবাকে তেমন ভালোবাসতাম না, তেমন কিছু মনে হত না।
আমার থেকে বড়োদের বললাম, আমিও ভোরে দৌড়াতে যাবো। আমায় নিত না। একদিন ওদের মধ্যে একজন বলল, ভোর চারটায় মন্দিরে কাছে এসে বসবি। আমিও ঠিক ভোর চারটায়, দাঁড়িয়ে থাকলাম। এই অল্প বয়স থেকে আমার সাহস দেখে অনেকে হতবাক। তারপর থেকে নিয়ম করে সকলকে ডাকতে যেতাম। প্রতিদিন ভোরের দৌড় ব্যায়াম আমাকে মানসিক শারীরিক ভাবে শক্তপোক্ত করে তুলল। আমিও কতকিছু দেখতে থাকলাম। ক্লাস সেভেনে ওঠার পর থেকে ইংলিশ ফ্লিম দেখতাম। বিকাল চারটে বাজলে, মেট্রো চ্যানেলে জিমনাস্টিক দেখতাম। তখন কবিতা আমার একদম ভালো লাগতো না। খালের জল ছেঁচে মাছ ধরতে চাইলেও পারতাম না। অন্যরা ধরে নিয়ে চলে যেত। অদ্ভুত ছিল সেই সময়। তখন থেকে আমার একজন ঘনিষ্ঠ বান্ধবী ছিল। আমরা একসঙ্গে ঘুরতাম, ফিরতাম, খেলতাম। আমার মন ভালো হয়ে যেত, যখন সেই কিশোর বয়েসে কোনো সমস্যা হত আমার পাশে এসে দাঁড়াতো। কষ্ট হতো ইতিহাসের বড়ো বড়ো প্রশ্নের উত্তর মুখস্ত করা, পারতাম না। কবিতা… সে তো অনেক দূর। প্রচন্ড ঠাকুর দেবতায় বিশ্বাস করতাম। অগাধ কৌতূহল নিয়ে সারাক্ষণ মাঠে ঘাটে ঘুরে বেড়াতাম। যা যা কয়েদ করা যায়, ধরে রাখতাম। পুষতাম। কুকুর, পাখি, নেউল, জলপোকা, মাছ, ইঁদুর আরও কতকিছু। আমার ভালোবাসায় নাভিশ্বাস উঠে যেত সেই সকল প্রাণের।
হঠাৎ একদিন মা ঠিক করলো, আমরা কলকাতা চলে যাবো। কথা মাত্র তাই ঠিক হল, গরু বিক্রি করে দেওয়া হল। সাংসারিক জিনিসপত্র ফেলে দেওয়ার বদলে অন্যদের দিয়ে দেওয়া হল। রাত থেকে উঠে আমরা বেরিয়ে পড়লাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে, আমাদের পৌঁছে দিল জরিনা, ছটকি এরা। আমার মা’কে ওরা খুব ভালোবাসে। কাল থেকে ওদের দেখতে পাবো না। আমাদের ঘরে এসে লম্বা দুপুরে পা দুখানা ছড়িয়ে দিয়ে আর গল্প করবে না।
রাস্তায় যাওয়ার সময় কাশেম আলির বউ আমাকে জড়িয়ে সে যে কত কথা। আমাকে অনেক খাওয়ার দিয়েছিল। মূলত ফল। কারবালার মাটি, পুটলি বেঁধে দিয়েছিল। বলল, ব্যাগে রাখবি। কখনো কোনো বিপদ হবে না।
তারপর ট্রেনে করে হাওড়া স্টেশন। তখন খুব ভোর। এই প্রথম সকালে গঙ্গা দেখলাম , হাওড়া বাসস্ট্যান্ডে গরম ভাতের ঘ্রাণ আর ফিঙে পাখির চঞ্চলতা দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। এই ছবি আজীবন মনে থেকে যাবে।
আমার এ্যাকাডেমিক পড়াশোনার ইতি ঘটলো। ব্যাগে তখন ক্লাস সেভেনের নতুন বই, খবরের কাগজ দিয়ে মলাট দেওয়া। বাবা মা তাদের নিজস্ব কলহে মেতে গেল। আমি একা-একা ঘুরে বেড়াতে লাগলাম। সেই প্রথম আমার ব্যাক্তিগত জীবন একদম নিজের মত করে শুরু। সেই প্রথম কবিতা লেখার চেষ্টা, প্রেম নয় প্রতিবাদ। আমার জগতে আমি একাই সদস্য। সেই বৈশাখের তপ্ত গরমের আলেয়া আমি আর কখনো দেখিনি।
Image Source: Wikipedia