রাজসী বসু কুণ্ডুর একটি পাঠপ্রতিক্রিয়া

মানভূম জার্নাল: “ও অশ্বত্থগাছ, নগর অসুখ কেন ছোঁবে আমার এ গরাম দেহ”

পাঠক এবং লেখকের যৌথ মননেই সার্থকতা পায় একটি বই। এই সার্থকতা প্রাতিষ্ঠানিক বা অর্থের দিক থেকে যত না বোঝা যায়, তারও বেশি বোঝা যায় যখন পাঠক-লেখকের ভিন্ন বোধ, সামাজিক অবস্থান মিশে যায় কাব্যের প্রবহমানতায়। ঠিক যেমন ভাবে পৌষালী চক্রবর্তী তার মানভূম জার্নালে লোকায়ত, শহরকেন্দ্রিকতা কে একই সাথে রেখেছেন, কখনো তা হয়ে উঠছে তার ব্যক্তিগত জার্নাল আর কখনো ব্যক্তি পেরিয়ে শালবৃক্ষ, আমরুহাসা নদীর চর ধরেই এগিয়ে চলেছে, এক সংলাপ।

জার্নাল নামটা শুনলেই মাথায় আসে দিনলিপির কথা। Diary, নিজের সাথে নিজের সংলাপ এইরকম কিছু ধারণা। তবে বইটার পাতা উল্টে দেখলেই ভুল ভাঙে পাঠকের। এ তো কবিতা-সেই তথাকথিত জার্নাল নয়, অন্তত আঙ্গিক বা ফর্ম এর দিক থেকে, তাহলে ‘জার্নাল’ কীকরে? পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগে এবং সে এগিয়ে চলে ‘নান্দীর’ কাছে।

“সরে যায় লেখক,
তাহার পড়ে থাকে শোক
এই কাব্যের সঙ্গে তোমার
মোলাকাত হোক”

এই যে লেখক নিজেই ঘোষণা করেছেন তার সরে যাওয়ার কথা, তাতে আরো প্রকট ভাবে ধরা পড়ছে কীভাবে এই জার্নাল পাঠকেরও নিজের কাব্য হয়ে উঠছে।

শালবৃক্ষ কথা দিয়ে শুরু হয় এই বইয়ের মূল পাঠ।

“গাছের কাছে চলো; পৃথিবীর ভালো হবে তাতে।”

যদি কঠিন শব্দে নাও বলি পরিবেশবাদ বা ইকো ফেমিনিজমের কথা, তবুও মানভূম, তার নিজস্ব দর্শনই বাঁচিয়ে, আগলে রাখে প্রকৃতিকে। এ যেন সত্যি এই ইট-কাঠ-পাথরের সভ্যতার থেকে অন্য স্রোতে চলা।

আর তাই, তার পরেই পাঠক ছুঁতে পারবেন,

“বিপরীত স্রোত সেই যমুনার ডুব
শুভ অশৌচ স্নানে আদি মাতাপিতা”

সত্যি, এ যেন লোকায়ত ধারণা কে শহরকেন্দ্রিক কোনো ‘চেখে দেখা’ নয়, এই বোধ অনুভবের, নগর অসুখ যেন নিজের শরীরকে না ছুঁতে পারে, এই গভীর আর্তি। এই তো নতুন জন্ম, নিষ্পাপ শিশুর মতোই যেন জগৎ সংসারকে নিজের করে ভাবা।

তবুও সেই শিশু জরাহীন নয়। হরপা বানে সেই জরা, ব্যধি সব সেরে যায়।

“হরপা বানের শেষ
খানাখন্দ দেয় উঁকি ঝুঁকি
আমি দেখি তার মধ্যে ভ্রুণরক্ত, মানুষের দেশ।”

‘মানুষের দেশ’ অদ্ভুত এক শব্দবন্ধ। দেশ যে কার, সে প্রশ্ন আরণ্যকেও উঠে এসেছিল, ভানুমতি কি এই দেশের নাগরিক?

এসব ভাবতে ভাবতেই বসন্ত রং ধরে গাছের পাতায়। সেই রঙে যেমন রাংনি ফুলের নোলক আছে, তেমনই আছে কিছু আঁধার মাখা দিন।

তাই, বসন্ত যাপন’এ লেখক তার নিপুণ চিত্রকল্পে গড়ে তোলেন,

“পোস্তবাটার মতো গাঢ় মেঘ করে উপদ্রুত অঞ্চলে”

এবং এই বোধ-চর্চার মধ্যে চর্যাপদ, বেরসার বোন সবাই মিশে যায়।

যেমন পশ্চিমের চর্যা গানে তিনি লিখেছেন,

“একখাতে উপায় আছে অন্যটি শুধুই শূন্যতা
মদ্যখাতে খেয়া দেয় ডোম্বী, পাটনী পরিত্রাতা।”

তাই জীবাশ্ম পেরিয়ে আমরুহাসা নদীতীর নিজেই বলতে শুরু করে,

“ভাবিকাল থেকে আসি, দেখে নিচ্ছি
গেরস্তের শঙ্খচূর্ণ হাতে উঠে আসছে প্রজাপতি কলকাকাটা”

শঙ্খ-চক্র-ফুলের নোলক পড়া মেয়ের দল-তাদের পুজোর থান সবাই যেন এখানে এক। কে যে কেন্দ্রে রয়েছে, আর কে যে কেন্দ্র থেকে বহির্ভূত, এই স্বাভাবিক বোঝাপড়ায় আঘাত হানা এই বই। তার সাথে উপরি পাওয়া লেখকের চিত্রকল্পে মানভূম কে দেখা, এবং অপূর্ব একটি প্রচ্ছদ।

এই কাব্যের সাথে সবার মোলাকাত হোক, এইটাই পাঠক হিসেবে আন্তরিক ভাবে চাইবো।

 

মানভূম জার্নাল

লেখক- পৌষালি চক্রবর্তী

প্রচ্ছদ – সেঁজুতি বন্দ্যোপাধ্যায়

প্রকাশক-ধানসিঁড়ি

মূল্য – ১২০/-

 

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Avatar photo

By রাজসী বসু কুন্ডু

অক্ষর আর আকাশ কুসুম স্বপ্ন বুনেই লিখতে ভালোবাসে। প্রকাশিত বই- মীরার গান, বিষণ্ণতার ছবি।

Leave a Reply