আধুনিক প্রকরণের স্নিগ্ধ ব্যবহারে মুখরিত কবি সাম্য রাইয়ান
একবিংশ শতাব্দীর নান্দনিক বোধ বাংলা ভাষার যে সব তরুণ কবিদের চেতনায় মূর্ত হয়ে উঠেছে, তাদের মধ্যে সাম্য রাইয়ান অন্যতম। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ তৈরি করে এক নতুন সার্বভৌম রাষ্ট্র ‘বাংলাদেশ’। যুদ্ধের অভিঘাত সাহিত্য চেতনায় নিয়ে আসে ব্যাপক পরিবর্তন। শিল্পে এর প্রতিফলন যেভাবে হওয়ার কথা ছিল, রাজনৈতিক উত্থান-পতন তার অনেকাংশকে স্তম্ভিত করেছে। নব্বই এর পর শুরু হয় গণতন্ত্রের পথে অভিযাত্রা। সারস্বত সমাজের আত্মপরিচয় নতুন করে নির্মিত হতে থাকে। ফলে আটের দশকের সাহিত্যবোধ নয়ের দশকে পায় নতুন মাত্রা। একুশ শতকে পা রেখে বাংলা সাহিত্য নবউদ্যোমে যাত্রা শুরু করে। বিদগ্ধ লেখকগণ বাস্তবতার আলোকে নিজেদের দার্শনিক চেতনাকে শাণিত করতে থাকেন। দ্বিতীয় দশকে বাংলা সাহিত্য পায় আত্মবিকাশের অবাধ সুযোগ। অতীতের অভিজ্ঞতা ও ভবিষ্যতের স্বপ্নের মিশেলে বাংলাদেশের সাহিত্য এক নতুন বাঁক নিতে শুরু করে। যার ইঙ্গিত খুব কম সংখ্যক লেখক ধরতে পেরেছেন। এদের মধ্যে সাম্য রাইয়ান তরুণতম।
বাংলা কবিতার সর্পিল গতিপথ জানতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরসহ অন্যদের চিনতে হবে। কিন্তু তাদের পদক্ষেপ অনুসরণ করলে নিজের স্বকীয়তা তৈরি হবে না। আবার পরিবর্তিত পরিস্থিতি তৈরি করে নতুন নান্দনিকবোধ। প্রত্যেক যুগেই এমন কিছু লেখক পাওয়া যায়, যারা সময়ের চাইতে এগিয়ে থাকেন। সচেতন লেখকগণের ভাবনা মূর্ত হয়ে ওঠে ষাটের দশকে। তাঁরা হাংরি আন্দোলন, শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলন, নিম সাহিত্য আন্দোলন প্রভৃতি নামে প্রস্তাব করেন নতুন যুগের সাহিত্য দর্শন। আধুনিকতার প্রতি অগ্রযাত্রায় এই নতুন সাহিত্যবোধ নাড়া দিয়েছিল সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ এবং প্রথাগত সাহিত্যধারণাকে। যারা পরিবর্তনের বার্তা বুঝতে পেরেছেন, তারা এগিয়ে গিয়েছেন ভবিষ্যতের পানে।
একুশ শতকে এসে সাহিত্য আন্দোলনগুলো বহুবিধ মাত্রায় বিকশিত হয়েছে। সাম্য রাইয়ান এই সময়ের আধুনিক চিন্তাচালিত মৌলিক রসবোধের কবি। বহুচর্চিত, পরিচিত, নিরাপদ পথের কাব্যচারিতাকে তিনি একঘেয়ে ক্লিশে মনে করেন। পুরনো আখ্যান, ছন্দ, বিন্যাস, উপমা, অলংকারের পুনরুৎপাদন তাকে ক্লান্ত করে তোলে। তাই পরিচিত উপাদান, দৃশ্য তার চোখে পায় নতুন মনোযোগ; পরিচিত অলংকার তার হাতে পায় নতুন শৈলী, প্রচলিত শব্দ জেগে ওঠে নতুন ভঙ্গিতে।
সাম্য রাইয়ানের বয়স এখনও তিরিশ পেরোয়নি। কিন্তু শব্দ চয়নে, বাক্যবিন্যাসে, দৃষ্টিকোণে, চিন্তা উপস্থাপনায় তিনি যে মৌলিকতার পরিচয় দিয়েছেন, তার শক্তি অপরিমেয়। তার কবিতার পংক্তিমালা ইতোমধ্যে মানুষের মননের গভীরতর স্থানে জায়গা করে নিয়েছে।
‘জীবনপুরাণ’ কবিতায় তিনি যখন বলেন— “বানান ভুল হলে কাছের মানুষও কাচের হয়ে যায়”, তখন পাঠক চমকে ওঠে। নির্মম একটি উপলব্ধি এত সহজে পরিচিত শব্দ সহযোগে আলগোছে উপস্থাপন করেন যে, পাঠক আনমনা হয়ে যায়।
সাধারণ চোখে প্রতিটি বিদায় মৃত্যুর নামান্তর। কিন্তু ফিরে আসার শুভকামনা তো মিশে থাকে প্রতিটি বিদায়ে। সাধারণের চিন্তাগত সীমাবদ্ধতা ছাড়িয়ে তাই সাম্য রাইয়ান জানতে চান এভাবে— “ব্যাগভর্তি গুডবাই নিয়ে চললে কোথায়?”
যেভাবে বললে বিদায়বেলা শোক নয়, আশাবাদের রঙে বর্ণিল হয়, ঠিক সেভাবেই তিনি বললেন। এ যেন সুবিমল মিশ্র’র মনোভঙ্গি। যিনি লিখেছিলেন, “বলার ভঙ্গিটাই যখন বিষয় হয়ে ওঠে”। সাম্য রাইয়ানের বলার ভঙ্গিটাও অনুপম। পাঠককে সহজে বিমোহিত করে ফেলে। আবেগে, আঙ্গিকে, চিন্তাপ্রসঙ্গে এমনকি চিন্তাপদ্ধতিতেও তিনি আধুনিক এবং নান্দনিক।
তবে অন্যদের মত উচ্চকিত স্বরে নয়, নিজেকে প্রকাশের উদগ্র বাসনায় নয়; আধুনিক প্রকরণের স্নিগ্ধ ব্যবহারে তিনি নমিত স্বরে উপস্থিত হন পাঠকের হৃদয়দ্বারে। মৃদু ছোঁয়ায় অবারিত হয়ে পরে কবিতামহল। যথাযথ শব্দের নিক্বণে মুখরিত হয় ছন্দ সরোবর। এজন্যই সাম্য সফল, এখানেই তার সার্থকতা।