ঋদ্ধি সাহার গল্প

শরীর যখন শিকল ভাঙে

রাত তখন প্রায় ১১টা। শহরের ব্যস্ততা কমে এসেছে, কেবল রাস্তার ল্যাম্পপোস্টগুলোর ম্লান আলো পথচারীদের ছায়া দীর্ঘ করে তুলেছে। একটি ক্যাফের কোণে বসে ছিল রাহাত। হাতে ধরা মোবাইলে সে বারবার সময় দেখছিল।

হঠাৎ দরজার ঘণ্টা বেজে উঠল। কালো রঙের ঢিলেঢালা পোশাকে এক তরুণী ঢুকল। স্লিম ফিগার, চোখে বুদ্ধিদীপ্ত দৃষ্টি, ঠোঁটে লালচে ছোঁয়া—এই মেয়েটাই মেহজাবীন।

রাহাত এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।

— “দেরি করলে কেন?”

মেহজাবীন বসতে বসতে বলল, “বাস আজও দেরি করল। আর তুমি তো জানো, আমিও খুব সময় ধরে আয়না দেখতে ভালোবাসি।”

রাহাত হাসল। মেহজাবীন তার দীর্ঘদিনের ক্রাশ। কলেজে পড়ার সময় থেকে তারা বন্ধু, কিন্তু গত ছয় মাস ধরে তাদের সম্পর্কটা অন্যরকম। আগের সেই সহজ বন্ধুত্বের মধ্যে একটা গা ছমছমে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। ক্যাফেতে আলো কম। মোমবাতির আবছা আলোয় মেহজাবীনের চেহারাটা আরও মায়াময় লাগছে। রাহাত চায়ের কাপে চুমুক দিল।

— “তোমাকে দেখে আজ একটু অন্যরকম লাগছে।”

মেহজাবীন চশমা খুলে টেবিলে রাখল। তার চোখে যেন স্নিগ্ধ বিদ্যুৎ খেলে গেল।

— “তুমি কি প্রেমে পড়েছ?”

রাহাত চুপ করে রইল। হ্যাঁ, সে প্রেমে পড়েছে, এবং সেটা একমাত্র মেহজাবীনের জন্য। কিন্তু প্রেমটা শুধু সরল ভালোবাসায় আটকে নেই—এর মধ্যে আছে শরীরের অদ্ভুত এক আকর্ষণ, যা প্রতিবার মেহজাবীনের পাশে থাকলে তার স্নায়ুর প্রতিটি কোষে জেগে ওঠে।

— “চলো, একটু হাঁটি,” মেহজাবীন বলল।

রাত তখন প্রায় বারোটা। তারা হাঁটছিল নির্জন রাস্তায়। হালকা শীতের আমেজ, নিঃশব্দ পথ, দূরে কয়েকটা গাড়ির হেডলাইট ঝলসে উঠছে। মেহজাবীন ধীরে ধীরে রাহাতের হাত ধরল। তার হাতটা উষ্ণ, নরম। রাহাত শিহরিত হলো। এই প্রথম সে অনুভব করল, ভালোবাসা শুধু হৃদয়ের ব্যাপার নয়—এটা অনুভূতিরও খেলা।

— “রাহাত, তুমি কি কখনো আমার কথা ভেবে রাতে ঘুমাতে পারোনি?”

— “অনেকবার।”

— “তাহলে আমাকে কখনো ছুঁতে ইচ্ছে করেনি?”

রাহাত চুপ করে গেল। তার রক্ত গরম হয়ে উঠল। সত্যি বলতে, সে বহুবার কল্পনায় মেহজাবীনকে ছুঁয়েছে, তার চুলের ঘ্রাণ নিয়েছে, তার কোমল ত্বকের উষ্ণতা অনুভব করেছে। কিন্তু বাস্তবে সে কখনো সাহস করেনি।

— “আজ যদি করি?”

মেহজাবীন ধীরে ধীরে সামনে এসে দাঁড়াল। বাতাসে তার চুল উড়ছে। চোখে একধরনের দুঃসাহসী দৃষ্টি।

রাহাত কিছু না ভেবেই তার মুখ ছুঁয়ে দিল। মেহজাবীন ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল। ঠোঁটের উষ্ণতা, নিঃশ্বাসের গতি—সবকিছু একসঙ্গে যেন শরীরের প্রতিটি কোষকে দুলিয়ে দিল। রাত আরও গভীর হলো। তারা ধীরে ধীরে এক পুরনো পার্কের দিকে এগোল। চারপাশে সুনসান নীরবতা। গাছের ছায়ায় এক ধরনের রহস্যময় অনুভূতি তৈরি হলো।

মেহজাবীন ধীরে ধীরে বলল, “তুমি কি জানো, আকাঙ্ক্ষা যখন খুব গভীর হয়, তখন তা কেবল প্রেমে সীমাবদ্ধ থাকে না?”

রাহাত তাকিয়ে রইল।

— “তাহলে কোথায় গিয়ে শেষ হয়?”

মেহজাবীন ধীরে ধীরে রাহাতের বুক স্পর্শ করল। তার আঙুলগুলো বরফের মতো ঠান্ডা, কিন্তু ছোঁয়াটা ছিল আগুনের মতো উত্তপ্ত।

— “তোমার কাছে শরীর আর আত্মা একসঙ্গে অনুভব করার মতো কিছু?”

রাহাত কিছু বলল না। সে কেবল অনুভব করল, এই রাত, এই স্পর্শ, এই গভীরতা—সবকিছু একধরনের রোমাঞ্চকর মোহের মতো।

মেহজাবীন ধীরে ধীরে বলল, “আজ রাতের জন্য শুধু অনুভব করি, ব্যাখ্যা নয়।”

রাহাত কেবল মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। অতঃপর, রাতের আঁধারে তারা দুজন দুটি দেহ হলেও যেন একসঙ্গে মিশে গেল—প্রেম আর আকাঙ্ক্ষার এক অবিস্মরণীয় যাত্রায়।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Avatar photo

By ঋদ্ধি সাহা

জন্ম ১৭ই ফেব্রুয়ারি ২০০২, নৈহাটি শহরে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে পড়াশুনা ও চর্চা। স্নাতক রামকৃষ্ণ মিশন বিদ্যামন্দির, বেলুড় থেকে। স্নাতকোত্তর যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ছোটবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ, ভালোবাসা। মিশন স্কুলে থাকাকালীন বিজ্ঞান ছেড়ে কলেজে উঠে সাহিত্য নিয়ে পঠনপাঠন ও পাশাপাশি লেখালেখির শুরু। বেশ কিছু পত্র-পত্রিকায় লেখা প্রকাশিত। ভালোলাগা - ফুটবল, লেখালেখি, সিনেমা।

Leave a Reply