কবিতার মতো প্রবন্ধ
আমি একটি শান্ত সাধারণ কবিতা লিখব ভেবে অশান্ত অস্থির হয়ে উঠলাম, কেমন অস্থির! ট্রেন যখন খুব দুলে ওঠে, যাত্রীর স্থিতাবস্থা বিঘ্নিত হয়, অমন। বাবার আনা পালঙ শাকে আমি তখন শুধুই কবিতা দেখি। শাকে পোকা নড়ে উঠলে কবিতা কেমন পচে যায়। একটাও স্থায়ীভাবের কবিতা পাই না। এরকম চঞ্চলতা শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর, এমন সাবধান বাণী শোনায় নিকটতম কবিতা সতীর্থরা। চলে যায় দিন। চুপ হই। কেমন এক কষ্ট কুরে খায়, কীসের এক কষ্ট
ও জীবন
সুদৃশ ক্যাফের গদিতে বসে দূরে ওই লাইম লাইটে থাকা নতমুখী মেয়ের গান শুনি। গান কী সুন্দর করে গাইছে মেয়েটি। হাতে মোবাইলে পড়ছে লিরিক। সুর তার মনের ভেতরই রয়েছে। ওই মেয়েটির মতো সুর আমরা সকলেই মনে রাখি, কথা শুধু বদলে বদলে যায়। গান নিয়ে যদি বলি, তাহলে বলতে হয় সে ভীষণ একলা এ শহরে, বেড়াতে এসেছিল এখন এই ক্যাফের কোলাহলে হারিয়েছে…
এই অন্যমনস্কতার ভেতর ফ্রেঞ্চফ্রাই পুড়িয়েছে জিভ, ও গায়ক, আলো অন্ধকারের গায়ক, তোমার জীবনের কোনও ঠাণ্ডা গান শোনাও। অপরাধ নিও না, তোমায় ফরমায়েশ করার স্পর্ধা নেই। শুধু একটি নিজের গান শুনিয়ো। সেই গান, যেখানে ভেসে যেতে পারব ডানাহীন হয়ে। চারিপাশে একটি দুটি করে বাড়িঘর পেরোতে পেরোতে পেরিয়ে যাব চেনা চারণভূমি। রূপকথার গল্পের কোনও দেশে যেতে চাই না, ওখানে খোক্কস থাকে, শুধু একটি নদীর পাড়ে চলে যেতে চাই যেখানে নৌকার দড়ি নেই, মাঝি নেই, আছে নৌকার নিজস্ব ছন্দ। ওইটিই তার নিয়ম। এমন কোনও গান জানা আছে তোমার? থাকলে, গাও। বদলে তোমায় সারাজীবনের কৃতজ্ঞতা নজরানায় দেব
অদৃশ্য
চারিদিকে এত কাজের অনুষঙ্গ ছড়িয়ে রেখে আর কোনও কবিতা লেখা যায় না। যায় না যায় না। মাথা ফেটে যায়, বসে থাকতে থাকতে ফোলা পা দুটি ব্যাকুল হয়ে ওঠে, ওরা হাইরোড দেখবে, জুতো পরিয়ে নিয়ে যাই দুটোকে, হাঁটাতে। হাঁটাহাঁটি হতে হতে ওরা তাচ্ছিল্য দেখে, দূরে কোনও এক ধাবায়, এক নির্লজ্জ মলিন লোক, বিবস্ত্রও হতে পারত, কিন্তু লোকসমাজ! তাই একটি পুরনো নরম জামা পরে হাত তুলে লোক
ডাকে। বৃষ্টির দিন, দু মুঠো বৃষ্টি পড়ে, কাদাজল ছিটিয়ে গাড়িগুলো লোকটির সমস্ত ডাক ব্যর্থ করে চলে যায়, ওরা ফেরে না। ধাবায় কাস্টমার ঢোকাতে ব্যর্থ হয়ে নেতিয়ে থাবা গুটিয়ে নেয়, পরক্ষণেই চাকুরির প্রধান শর্ত মনে রেখে আবার আবারও গাড়ি ডাকার প্রয়াস। চাঁদ নামে, ওরা কেউ গাড়ি হতে নামে না। এতসব দেখে পা দুটি ফিরতে চায় বাড়িতে। তারা এড়িয়ে যাওয়া হাইরোড ভুলতে চায়। আমার পা দুটিও নিজেদের নিম্নবর্গের ভাবে, হয়তো মলিন লোকটির সাথে মিল পায়। তাই তারা সে হাইরোড এড়াতে চায় যেদিক দিয়ে ছুটে যায় কাস্টমার কথাটির মতো রূঢ় মানুষ। হয়তো এই মানুষকে তারা ধর্তব্যের মধ্যে ফেলে না। হাত নেড়ে লোক ডাকা লোকটি কি ভোট দেয়? আদমশুমারীর সময় কি ওর কোনও ডাক আসে? বাড়ি এসে কেউ খোঁজ নেয়? পেশা হিসেবে লোকটা কিসের কথা লেখে? জানি না। কেউই বোধহয় জানে না। মলিন লোকটি নিজেও নয়…
কিশমিশ
কারা যেন বলে আমি ইনট্রোভার্ট, আমি নিজেও তাই মনে করি। মনে করি বলেই আমার কখনও কবিতা ছাড়া উপন্যাস কিংবা নিদেন পক্ষে গল্প, মায় একখানি ছোটগল্পও লিখে ওঠা হল না। এত কম কথা বলি বলেই বেড়াতে যাওয়া নিয়ে ফিরে এসে কারোর সাথে আড্ডার ঠেকে গল্প
হয় না, কী জানি, আমায় কখনও কিছু বলে উঠতেই দেয়নি বাকিরা, কথা বলতে বলতে যদি দুই লাইন পরেই ট্রেনের প্রসঙ্গ আসে, তারা সেই ট্রেন নিয়ে তাদের সাথে ঘটে যাওয়া বহু মূল্যবান ঘটনা রসিয়ে বলে দেবে, কিংবা যদি বা আড়াই লাইনে একটি নৌকার কথা ওঠে তারা পুরো আড্ডার তরী পার করে দেবে নিজস্ব গল্পের নাও দিয়ে এমতাবস্থায় আমার নিরীহ সামান্য সামাজিক গল্প মিইয়ে যাওয়া ফুচকা হয়ে দুমড়ে মুচড়ে নেতিয়ে যায়, তারা আর উঠে বসারও বা ঝাপট দিয়ে ফুলে ওঠারও চেষ্টা করে না। একে তো জীবনটা সাদামাটা, এর ভেতর অ্যাডভেঞ্চারাস তেমন কিছুই নেই, যা দিয়ে রোয়াব নিয়ে কলার তুলে গল্প বলা যায়, তারপর আমি কাজকর্ম করলেও সকলেই ভাবে, কী যে করে, শুধু শুয়ে বসে থাকা ছাড়া, এদিকে বাড়ি থেকে যদি ঘুরতে বেরিয়ে যাই বেশ কয়েকদিনের জন্য, যেহেতু আমি কাজ করি না এবং ঝাড়া হাত পা, তখনই দেখি বাবার সবচেয়ে বেশি কল আসে, ফিরে আয় তাড়াতাড়ি, ব্যাঙ্কের কাজ বাকি, অমুক জায়গায় যাওয়া বাকি, ওটার সার্ভিসিং বাকি, হ্যানত্যান কিছু খুবই অকাজ বাকি। এমতাবস্থায় আমার জীবনে আর কীইবা চড়াই উতরাই হওয়ার, যে তার গল্প সকলে মন দিয়ে বসে শুনবে। বাকি আমার কোনও কেরিয়ার পড়াশোনার গল্প নেই, আমার এটুকুই শুধু বলার যে আমি আকাট মূর্খ নই, সইটুকু করতেই পারি, কিন্তু সে দিয়ে কি আর ঠেকের গল্প হয়? হয় না। এমন কোনও দুঃখ নেই যা নিয়ে দুটো কথা লিখতে পারি, এমন কোনও অভিজ্ঞতা নেই যা আড্ডায় বাকিদের কাজে আসতে পারে। নেই। কিছুই নেই। আমার ঊনত্রিশ বছরের জীবনে বলার মতো কিছু নেই, এটুকুই আস্তে আস্তে প্রমাণিত হওয়ার পর, আমি চুপ থাকি। বাজারে ইনট্রোভার্ট কথাটি বেশ রমরমিয়ে চলছিল বলে, ওটুকু নিয়ে এখন ব্লেজার হিসেবে পরে থাকি। এতে দারুণ সুন্দর একটা গায়ের প্রলেপ তৈরি করা যায়, কোথাও শুনেছিলাম, মরুভূমির দেশে খুব গরমেও নাকি সকলে পশমের কোট পরে থাকে, তাতে লু এসে গায়ে যখন তখন আঁচড়াতে পারে না, ইনট্রোভার্ট শব্দটি আমার ওই পশম। কতবার মনে মনে ভেবেছি, কোথাও আড্ডায় কিছু বলব না, শুধু শুনব। বাড়ি এসে লিখব, নিজে যা বলতে চেয়েছি, মাঝে মাঝে ডায়েরির আইডিয়া আমারই ভালো লাগে না, মনে হয়, এই যে আমি নদী দেখি, পুকুর দেখি, গাছ দেখি সব দেখি আমার নিজের মতো করে, কখনও কি বলব না আমার এই অভিজ্ঞতা? আমার দু একটি, হ্যাঁ, গুনে গুনে দুটি বা তিনটি এমন লোক আছে, যাদের কাছে মাঝে মাঝে বসে পড়ি ঊনত্রিশ বছরের কথা নিয়ে। তখন নিজেই অবাক হয়ে যাই, এত অসংখ্য নক্ষত্ররাজির মতো কথা ছিল আমার কাছে? কোথায় ছিল? কোথায় ছিল তারা লুকিয়ে? এখন যেমন কথা বলতে ভালো লাগে না, তেমনি কথা শুনতেও ভালো লাগে না, কত কার কাহিনি, কত কী প্রশ্ন, বাড়ি কোথায়, কী করি কখন ঘুমাই… আর এত কিছু ভালো লাগে না। এতবড় কেকের থেকে, একটুখানি কেক সরিয়ে নিজের ঘরে এসে বসেছি, বহুদিন হল। সেই কেকে প্রকট হওয়া তিন চারটে কিশমিশ নিয়ে বড় ভালো লাগে, সময় কাটাই টক মিষ্টি নিয়ে
উত্তরবঙ্গ জার্নাল
১
জানি না, একথা কতটা লিখে বোঝাতে পারব। আমার ডায়েরি জুড়ে এখন উঠে আসবে উত্তরবঙ্গ এক্সপ্রেসের এস ওয়ান কামরাটির একটি খণ্ড। সহযাত্রী যারা আছে, তারা সকলে কলেজে পড়ে, ওড়ার ডানাটি গজিয়েছে হয়তো, বিক্ষিপ্ত হাসির দমকে খাবলে খাচ্ছে আধা কূপকে। উপরের শয়ন সিটে শুয়ে-বসে আমি গন্তব্যের অপেক্ষা করছি, বারো ঘন্টা বা তারও বেশি কিস্যা। মাথাটি ধরেছে। চারিদিকে সদ্য ওড়া ফড়িং এর ডানার ফরফর। ‘চৈত্রে, গৌরীপুর ’ পড়তে গিয়ে বারবার একই লাইনে ঘুরে মরছি। মাথার ভেতর লাইনগুলো দল বেঁধে ঢুকে গিয়ে আবার কুজকাওয়াজ করে নেমে যাচ্ছে, নামতে নামতে ওরা… দূরে…আরও দূরে… নির্জন স্টেশনে বসে দেখছিলাম দুটি রেললাইন আলাদা হয়ে পৃথিবীতে এসেও জড়িয়ে ধরেছে পরস্পরকে। হাড়গোড় পাঁজর রক্তমাংস মাখামাখি হয়ে পড়ে আছে। তাদের চুম্বনের নিস্তব্ধতা বিদীর্ণ করে হাজার কয়েক লোককে নিয়ে দুদ্দাড় শব্দে, এই এখন চলে যাচ্ছে ট্রেন। বুকের ভেতরে ঠেলে উঠে আসছে ভয়…ওই ঘন জঙ্গল বুঝি আমার দিকে চেয়ে আছে, নাকি চেয়ে আছে সঙ্গমরত লাইনের দিকে—
লাল সিগনালের পাশে আলাদা হলো দুটি লাইন, দূরে গেল জঙ্গল, ভয়—
২
ঝালমুড়ি ঝালমুড়ি, চায়ে— গরম চায়ে, পানি ঠাণ্ডা পানি, হেডফোন ইত্যাদি বিক্রিবাট্টার মাঝে মনকে নিয়ে হাটের মাঝারে বেচতে বসি। রমনীগণ যে যার বাঙ্কে উঠে পড়ে, শুরু হয় গোপন ও শিহরিত প্রেমালাপ। ফোনপর্ব। টিটি আসে, যন্ত্রের মতো নাম চেক করে চলে যায়… ট্রেন চলতে থাকে। হারিয়ে যাওয়ার পর্ব আসে। মায়ের চাদরটি আপার বার্থে বিছিয়ে বিছানা করে শুয়ে পড়ি। এই চাদর, কেন এই চাদর আমার সমস্ত জার্নির অকাট্য অংশ হয়ে ওঠে… মাথার যন্ত্রণা ঘিরে ধরে। তবুও খেতে হবে। নেক পিলো থেকে মাথা তুলে ব্যাগে হাত ভরে দিই সটান। আমার খোপের সকলের খাওয়া হয়ে গেলেও তিন যক্ষিণী যেন ভুলে গেছে খেতে, অপার সময়। তারা এপার ওপার সিটে সেতুর মতো পা তুলে গল্প করতে ব্যস্ত… দোসরে দোসরে প্রাণালাপ অনন্ত, এমনটা হওয়াও অস্বাভাবিক নয়। আমার উদরপূর্তির পর শুয়ে থেকে থেকে এসব দেখা ছাড়া আর কোনও উপায় নেই, পায়ের উপর পা দিয়ে ডিঙা বেঁধে চাদরে শুয়ে শুয়ে ভাবি, শূণ্যপুরে একা থাকা শান্তির। কিন্তু এ মানবী হাটে একা হতে চাওয়া বড় দুঃসাহসের কাজ। একে একে সব কথা উড়তে থাকে চারিপাশে। কারোর ফোনে কান্না, কারোর মুখচাপা ফিসফাস, কারোর বা সুখনিদ্রার নাসিকা গর্জন… সুর ও অসুরে সংঘাতও উড়তে থাকে, ঘুরে ঘুরে চারিপাশে মরে, ঘুরতে ঘুরতে…ট্রেনের হৃদয় বিদারক আওয়াজে ভেঙে গুঁড়ো হয় ফারাক্কার জলের গান
৩
পৃথিবীর আলো ধীরে ধীরে কোথাও উধাও হল। ঘুটঘুটে অন্ধকারে মুখের সামনে একটি করে নীরব বাতি জ্বলছে সকলের। ফ্যানের হাওয়া মাঝে মাঝে উঁকিঝুঁকি মারছে, আবার মাঝে মাঝে লুকিয়ে পড়ছে। মেসেজে বন্ধু জিজ্ঞেস করল, কবে ফিরব! বললাম, ফেরার টিকিট নেই, বলতে চাইলাম, টিকিট কাটিনি। কিন্তু কথোপকথনে উঠে এল এক অদ্ভূত সত্য। ফেরা! যক্ষিণীরা চুপ করেছে। কলতান থেমে গেলে আশ্চর্য শীতলতা গ্রাস করে। এই অঞ্চলে ফোনের ঈষৎ আলো জ্বেলে, একমাত্র আমিই লিখে চলেছি ট্রেনের রকমারি হরকত… উত্তরবঙ্গের জার্নাল…