অপরাজিতা – এক হার না মানার আখ্যান

গত রবিবার গিরিশ মঞ্চে দেখে এলাম তূর্ণা দাসের পরিচালনায়, অন্য থিয়েটারের নাটক- অপরাজিতা। নাটকটা দেখতে বসে প্রথমেই যা নজর কাড়লো তা হল মঞ্চের স্পেস এর চমৎকার ব্যবহার। মঞ্চের মাঝখানে তৈরি হয়েছে সাধারণ এক গেরস্থ বাড়ির ঘর। চারিপাশে চার দেওয়ালের মাপে কিংবা আরো একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে সামিয়ানা বুনেছে তিনদিক থেকে ঝোলানো শাড়ি, নিত্য প্রয়োজনীয় জামাকাপড়। একটা খাট তার নিচেই রাখা সাংসারিক টুকিটাকি, বয়াম ভর্তি নাড়ু, গামলা, ধূপদানি এ যেন আমাদের হারিয়ে যাওয়া বাড়ির লাল রঙা মেঝে, যে মেঝে ঠান্ডায় দু’দণ্ড জিরিয়ে নেওয়া যায় দৈনন্দিন জীবনের সব দুঃখ কষ্ট ভুলে গিয়ে।

মঞ্চ সামগ্রীতে এছাড়া রয়েছে একটা বেতের মোড়া আর এই নাটকের প্রাণভোমরা একটা টেলিফোন যেখানে কল আসবে বলে অপরাজিতা বসে থাকে, আর তিনটি চরিত্র যারা প্রায় দেড় ঘন্টা চুপ করিয়ে বসিয়ে রাখে দর্শকে, একেবারে মুগ্ধ করে রাখে তাদের অভিনয়ের জোরে।

তিনটি চরিত্রের মধ্যে অপু অর্থাৎ অপরাজিতা বিবাহ বিচ্ছিন্ন বোন দাদার বাড়িতে “আশ্রিতা”। সে সারাক্ষণ হেসে খেলে জীবন সুধায় পরিপূর্ণ নাকি সেই পরিপূর্ণতার সাময়িক ছাপ তার অপূর্ণতাকে ঢেকে রাখার বয়ান? প্রশ্নটা নাটক যতই ফুটে ওঠে অভিনেত্রীর বিভিন্ন ম্যানারিজিমে এবং তার অভিনয়ের মুন্সিয়ানায়।

তবে শুধুই কি বিবাহিত বোন দাদার পরিবারে থাকে বললেই তার পরিচয় শেষ হয়ে যায়? ম্লান হয়ে যায় তার ছোট থেকে গান শেখার ইচ্ছে তার হয়ে মার বারবার তদবির করা বাবার কাছে? যদিও বারংবার উত্তর এসেছে “না। এই সংসারে কটা পয়সা বাঁচে যে মেয়েকে গান শেখাবে?বরং ঘরকন্না শেখাও ভালো করে কাজে আসবে।”

কখনো নৈহাটির দেওর বা মাসি শাশুড়িকে নকল করতে করতে অপুর বয়স্ক মা এবং অপু তাদের না পাওয়া গুলোকে ভুলে থাকতে চেষ্টা করে। এই ভুলে থাকার বোধ বোধহয় মেয়েদের সহজাত, তাই বারবার অপুর বৃদ্ধ মা তার নিজের বয়সটা কমিয়ে বলেন বা ভেঙে যাওয়া ডান হাতটাকে সারাতে চান না। এক বছর হলেও সময়কে যেন থামিয়ে রাখার তাগিদে, অন্তত কিছুক্ষনের জন্য হলেও, এই এক আশ্বাস, ভরসায়।

থমকে যায় অপু যখন সে শুনে তার পিসি তাকে আয়ার কাজ করতে বলছে টেলিফোন করে। একটা চাকরির খুবই দরকার তাইতো সে অপেক্ষা করে আছে সঞ্জীব দার টেলিফোনের। ঠিক যেমন ভাবে বসে থাকে উকিলের কাছ থেকে আসা মেয়েটি এবং জীবন তাদের বারবার বারবারই ভীষণ রকম ভানুমতীর কথায় “বেওকুফ” বানিয়ে যায়।

তবু অপরাজিতা তার মা উকিলের বাড়ি থেকে আসা মেয়েটা হারেনা। হারে না ‘বাচ্চা-বুড়িও’ যে নিজের আয়ু বিক্রি করে। সে ছিল পোড়ো জমিদার বাড়ির মেয়ে বা বৌ। তার কেটে যাওয়া ছড়াগুলো বলতে বলতে ধরে আসে ওই মেয়েটার গলা। এবং বারবার বাস্তবে মাটিতে তাদের এনে ফেলে টেলিফোনগুলো, estrangement এর মতোই। “প্রতিভা সরকার আছেন?” এবং তার সাথে নানা অদ্ভুত অসভ্য প্রশ্ন তবুও এই তিনটে চরিত্র তাদের নিয়তির নির্ধারিত পথে বিষন্নতায় ভর করে বসে থাকে না। বরং প্রাণশক্তিতে ভরপুর এক বৃদ্ধা এক মাঝবয়সি ভদ্রমহিলা এবং এক তরুণী মেতে ওঠে একসাথে “এই মায়াবী তিথি” গানের সাথে। আলো-আঁধারির খেলায় সত্যিই এ যেন এক মায়াবী তিথি, এ কলকাতা বন ছেড়ে কেন হবো পগার পার? বাংলা থিয়েটারের মঞ্চ এক অদ্ভুত মুহূর্তের সাক্ষী থাকে, তৈরি হয় এক ‘feminine স্পেস”, যা একান্ত তাদের নিজস্ব আর হেরে যায় তাদের চারিত্রিক ব্যবধান, সেই ব্যবধানগুলি কোথাও গিয়ে তাদের হাসির কান্না হীরা পান্নার সাগরে এক হয়ে যায়।

শাড়ির আঁচল সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানো, বাড়িকে আঁকড়ে থাকা এক গেরস্থালির গল্প মনে করিয়ে যায় দর্শকদের আমরা সব মেয়েরাই বোধহয় এক। নাটকে আলোর ব্যবহার এবং আবহসংগীত এক মেধাবী মনন ও দর্শনের পরিচয় দেয়। যেখানে বড় বড় নাট্যকারদের বড় বড় মঞ্চসজ্জা, অভিনেতা পোশাক, সাজ, সেখানে আটপৌরে শাড়ির সামিয়ানা ঢাকা একটা ঘরের গল্প বোধহয় একজন মেয়েই বলতে পারে, এত সহজ-সরল ভাবে। কলকাতা শহরে দুর্ভাগ্য যে এই নাটক হাউসফুল হয় না রবিবারের সন্ধ্যাতেও, হয়তো অন্য জাঁকজমক এর ভিড়ে অপরাজিতাদের চোখে পড়ে না মানুষের, তবুও মায়াবী তিথি হোক বা যে কোন সাধারণ দিন তারা নিরলস ভাবে গল্প বলে যায়।

ভালো লাগলে শেয়ার করুন
Avatar photo

By রাজসী বসু কুন্ডু

অক্ষর আর আকাশ কুসুম স্বপ্ন বুনেই লিখতে ভালোবাসে। প্রকাশিত বই- মীরার গান, বিষণ্ণতার ছবি।

Leave a Reply