আজ ছোটুকে বেশ অনেকদিন পর ছুটি দিয়েছে সম্রাট। পুরো পুজো এবং কালীপুজোতে খুব ধকল গেছে। হেমন্তের বার্তা বয়ে আনছে হাল্কা ঠাণ্ডা হাওয়া৷ কুয়াশাঘেরা সন্ধ্যে নামছে….শান্তিনিকেতনে। সমগ্র সিঙ্গি গ্রামে। এখন দু’তিন দিন কোন বুকিং নেই। পুজোর ক’টা দিন সুতনুকা, সৌমাল্য আর ওদের ছানা ঋক আসাতে খুব ভালো কাটল সম্রাটের। সুদেষ্ণা আসবে কাল। দিঠি বাইরে পড়তে যাওয়ার পর থেকে খুব বেশি এখানে আসে না সুদেষ্ণা।
সুতনুকার জন্য আরও একবার শ্রীবাটি ও জগদানন্দপুর ঘুরে এল সম্রাট৷ মেয়েটা ব্লগার। ইতিহাসে উৎসাহী। ছোট্ট ঋক তো হোমস্টের গন্ধরাজ লেবু দেওয়া ওয়েলকাম ড্রিংক পেয়ে দারুণ খুশী। সম্রাট আঙ্কলকে সে তার ‘ক্যাপ্টেন হ্যাডক’ বানাবে। বাবার মুখে শোনা শ্রীবাটির ইতিহাস সুতনুকাকে শোনাল সম্রাট৷ এই পৈতৃক জমিটি যখন পাওয়া গেল বাবা প্রায়শই আসতেন এই সিঙ্গিতে। ঘুরে ঘুরে দেখতেন চারপাশের সব গ্রাম-গাঁ। সিঙ্গির এই বাড়ির প্রতিটি ইঁট যেন ইতিহাসের গল্প শুনে শুনেই গাঁথা পড়ল।
ইতিহাস অনুযায়ী সিঙ্গি ছিল জাহাঙ্গীরাবাদের অন্তর্গত ইন্দ্রানী পরগনার একটি গ্রাম। সে প্রায় চারশ বছর আগের ঘটনা। মহাকবি কাশীরাম দাস এই গ্রামে বসেই মহাভারতের বাংলা ভাবানুবাদ করেছিলেন। মহাকবি আজ আর নেই। কিন্তু তাঁর জন্মভিটে, কেশেগড়ে পুকুর(মহাকবি এই পুকুরে স্নান করতেন বলে তাঁর নামেই এই পুকুরের নাম, স্থানীয় মানুষের বক্তব্য অনুযায়ী) এখনও আছে !
মধ্যযুগে শ্ৰীবাটি বিখ্যাত ছিল চন্দ্ৰ-বংশের জন্য।নদী-বিধৌত শস্য-শ্যামলা বাংলায় তখন ভিড় জমাতে শুরু করেছে নানা জায়গা থেকে আসা ভাগ্যান্বেষীরা। সেই সময় নুনের ব্যবসা করতে গুজরাত থেকে বাংলায় ঘাঁটি গেড়েছিলেন এক দল ব্যবসায়ী। নুন সেই সময় খুবই মূল্যবান ব্যবসায়িক সামগ্রী, লাভজনক; তার উপর চন্দ্রদের ব্যবসা ছিল একচেটিয়া। কাটোয়ার গঙ্গার ধারে লবণগোলাই ছিল ব্যবসার কেন্দ্র। চন্দ্ৰ পরিবার ক্রমশ ফুলেফেঁপে ওঠে। তাদের বাসস্থান ছিল তখন আর এক গুরুত্বপূর্ণ বন্দর সপ্তগ্রামে।
মরাঠা বিপ্লবের সময় যখন সপ্তগ্রাম আক্রান্ত হয়, তখন এই শাণ্ডিল্য গোত্রীয় চন্দ্রবংশের কোন এক বংশধর কুলদেবতা শ্ৰীশ্ৰীরঘুনাথজিউ ঠাকুর সঙ্গে নিয়ে বর্ধমান জেলার কৈথন গ্রামে বসবাস শুরু করেন। সেখানে নানা অত্যাচারে উৎপীড়িত হয়ে স্বৰ্গীয় শোভারাম চন্দ্র জমিদারি কেনেন এবং ১১৬০ বঙ্গাব্দে কুলদেবতা ও পুরোহিত-সমভিব্যাহারে কাটোয়া থানার শ্ৰীবাটি গ্রামে উঠে আসতে বাধ্য হন। তখন থেকে শ্রীবাটির উত্তরোত্তর ‘শ্রী’ বৃদ্ধি হতে থাকে। দান-ধ্যানে শ্রীবাটির জমিদার বাড়ির তখন বঙ্গদেশে খুব সুখ্যাতি।
বাবার কাছে শোনা গল্পগুলো সুতনুকাকে বলার সময়ও কেমন যেন গায়ে কাঁটা দিচ্ছিল সম্রাটের। আজ এই পড়ন্ত বিকেলেও একই অনুভূতি।
শ্রীবাটির চন্দ্রবাড়ির পাশেই রয়েছে টেরাকোটার কাজ সম্বলিত তিনটি শিব মন্দির। বাংলার ১২৪৩ সালে শ্রীবাটি গ্রামের জমিদারের ঠাকুর বাড়ি লাগোয়া ৭ শতক জায়গার উপর চার বছর ধরে চন্দ্র পরিবারের অর্থ থেকে প্রায় ৩ লাখ সিক্কা ব্যয়ে ২৬ ফুট উচ্চতা বিশিষ্ট একটি পঞ্চরত্ন মন্দিরসহ (রামকানাইচন্দ্রের স্ত্রী অন্নপূর্ণা দাসীর ইচ্ছায়-১৮৩৬ খ্রিস্টাব্দে) আরও দুটি মন্দির তৈরি করা হয়। তখন কাশী থেকে শাস্ত্রজ্ঞ পণ্ডিত আনিয়ে শাস্ত্রীয় মতে যজ্ঞ করে এই মন্দির প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। অষ্টকোণাকৃতি এই মন্দিরগুলির সারা গায়ে রয়েছে নজরকাড়া টেরাকোটার নিখুঁত কাজ।
তিন মন্দিরের দেবতারা হলেন ভোলানাথ, চন্দ্রেশ্বর ও শিবশঙ্কর। মন্দির তৈরির কাজে দাঁইহাটের ভাস্করদের, হুগলির কাঁকড়াখুলির শিবমন্দিরের কাজ করতে আসা মিস্ত্রির দলের সাহায্যও নেওয়া হয়েছিল। মন্দিরের গায়ে টেরাকোটার কাজ আজও অক্ষত রয়েছে। তিনটে মন্দিরের গায়ে টেরাকোটায় চিত্রিত আছে বিভিন্ন দেব- দেবীর মূর্তি, পুরাণ কথার নানা কাহিনি, কৃষ্ণলীলা, তখনকার সময়ে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনার দৃশ্য। মন্দিরের গায়ে দেবতার মূর্তিগুলির মধ্যে চামুণ্ডা কালী, মহিষাসুরমর্দিনী, জগদ্ধাত্রীর অপূর্ব কারুশোভা দেখে বোঝা যায় শিল্পীর কুশলতা। অসাধারণ দৃষ্টিনন্দন সেই সব টেরাকোটার কাজ নানা জায়গার শিল্পীদের দিয়ে করানো হয়। টেরাকোটার সেই সব ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মূর্তির কী অপরূপ ভঙ্গিমা, কী নিখুঁত মুখশ্রী; শিল্পীর কি অনুপম সৃষ্টি। কালের গ্রাসে সুন্দর স্থাপত্যগুলি চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। গ্রামবাসী উদ্যোগী হয়ে মন্দিরগুলিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছে।
জমিদার বাড়িটি আজ ভগ্নপ্রায়। ভাবলেও অবাক হতে হয় একসময় ‘চন্দ্র’ পরিবারের এই প্রাসাদোপম বাড়িটার ভেতরে ছিল ঐশ্বর্য-বৈভবের ছড়াছড়ি, আর আজ সে নিজেই অস্তিত্ব সঙ্কটে ভুগছে। যেখানে একসময় সন্ধ্যাবেলা জ্বলে উঠত ঝাড়বাতি আজ সেখানে কুলুঙ্গির প্রদীপও নিভন্ত। একাল আর সেকালের কী বিষম পার্থক্য। ধর্ম, সংস্কার আর বর্তমানের দৈন্য মিলেমিশে যেন জমিদার বাড়িটি হাহাকার করছে।
ঘরের ভিতর থেকে সম্রাট একটি চাদর নিয়ে এল। আকাশে তারা ফুটছে আস্তে আস্তে। ঋক বড্ড মায়ায় জড়িয়ে দিয়ে গেছে। পাঁচ বছরের ছেলেটি সারাক্ষণ সম্রাটের হাত ধরেই ঘুরত৷ দিঠির ছোটবেলা মনে পড়ে যাচ্ছিল।
যে বাবা এখানে বাড়ি তৈরির প্রতিটি ইঁটের হিসেব রাখতেন, আঁচলে প্রদীপের আগুন লেগে মা’এর অকস্মাৎ মৃত্যুতে কেমন যেন উদাসীন হয়ে গেলেন। বলে দিলেন এ বাড়ি বিক্রি করে দিতে। সম্রাট ও তার জীবনসঙ্গিনী সুদেষ্ণার এই মতে সায় ছিল না। তখন থেকেই তিলে তিলে ‘শান্তিনিকেতন’ রচনা। শেষে চাকরি ছেড়ে সম্রাটের শান্তির আশ্রয় এটি৷

আকাশে ধীর লয়ে জেগে উঠছে কালপুরুষ-সপ্তর্ষি। সৌমাল্য বলছিল এত পরিস্কার আকাশ নাকি দেখাই যায় না কলকাতায়। কি যে বলে ছেলেটা! ওদের পছন্দ হয়েছিল ছাদের ‘পোস্ত’ ঘরটা। ঘরে ঋজুদা সমগ্র দেখে সুতনুকা’র আনন্দ আর ধরে না।

গতকাল সম্রাটের কথা হচ্ছিল লক্ষ্মণ ভাস্করের সাথে। লক্ষ্মণের বাবা ছিলেন সম্রাটের বাবার বন্ধু৷ ওরা বংশ পরম্পরায় নতুনগ্রামে পুতুল বানায়।
এখনও অনেক বাড়িতেই ঠাকুমা-দিদিমারা তাঁদের নাতনীদের লক্ষ্মীপেঁচার গল্প শোনান। লক্ষ্মীপেঁচা অর্থে সমৃদ্ধি ও ধনের দেবী লক্ষ্মীর বাহন পেঁচাটি। তাঁদের মতে সেই সব সংসারেই সমৃদ্ধি উপচে পড়ে যেখানে একটি হলেও কাঠের লক্ষ্মীপেঁচা ঘরে রাখা থাকে। লক্ষ্মণরা মূলত এই পেঁচা বানানোর কাজই করে। এই ধরণের কাঠের পেঁচাগুলি অন্য বিভিন্ন আসবাবপত্র যেমন আয়না,ছোট বসার টুল প্রভৃতি বানাতেও ব্যবহার হয়। কাঠের এই পেঁচা মূলত গ্রামবাংলার প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী শিল্পের একটি প্রতীক। অনেক পৌরাণিক দেব-দেবী এবং অবতারও এই কাঠের পুতুলের মাধ্যমে ফুটিয়ে তোলা হয়। পেঁচা ছাড়াও চৈতন্য মহাপ্রভুর দুই বাহু তুলে হরিনাম নৃত্যরত আঙ্গিকে হলুদ বা সবুজ ধুতি-পরিহিত পুতুলও নতুনগ্রামে খুব জনপ্রিয়। এছাড়াও আছে রাজা-রানি, বর-বউ, হাতিযুগল, ঘোড়াযুগল, গণেশ, লক্ষ্মী, কৃষ্ণ ইত্যাদি। সৌমাল্যরা সম্রাটের নির্দেশেই গিয়েছিল এক বেলার জন্য নতুনগ্রামে। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে এসে যে গল্প শোনাল ওরা, সম্রাটের বেশ মন খারাপ হয়ে গেল।
শান্তিনিকেতন হোমস্টে থেকে এক ঘন্টার রাস্তা মাত্র এই কাঠপুতুলের গ্রাম। একটি খেতজোড়া রেললাইন পেরোতে হয়। বড় বড় গাছের ছাউনি দেওয়া অপূর্ব যাত্রাপথ। নতুনগ্রামে পৌঁছলে সৌমাল্যদের উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছিল লক্ষ্মণ । হোমস্টের ডাইনিং রুমে একটি অপূর্ব সুন্দর আয়না আছে। ফ্রেমটির চারিদিকে কয়েকটি কাঠের প্যাঁচা এবং সামনেকার সামান্য জিনিস রাখার অংশটিও বেশ মজবুত ও সুসজ্জিত। কথা শুনতে শুনতে সম্রাটের মনে পড়ল সুদেষ্ণা খুব যত্ন করে আয়নাটি বানিয়েছিল লক্ষ্মণকে দিয়ে। সম্রাট বুঝল ওদের ঘুরে ঘুরে সব দেখাতে দেখাতে লক্ষ্মণ নিজের গ্রামের ও গ্রামের মানুষদের কথা, তাদের এই অসাধারণ শিল্পকথার এক গাথা পুরোটাই সৌমাল্যদের বলেছে।
কাটোয়ার অগ্রদ্বীপ লাগোয়া ছোট্ট, শান্ত, লক্ষ্মীশ্রী এই গ্রামে গোটা চল্লিশেক পরিবার কাঠের পুতুলসহ নানান আসবাবপত্র তৈরি করেন। এনাদের এই অনন্য সৃষ্টিকে কুর্নিশ জানিয়েছে সারা দেশ। বিদেশেও বর্তমানে বহু সৃষ্টি রপ্তানি হয়। এই গ্রামের শিল্পী শম্ভুনাথ ভাস্কর এই শিল্পের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৬৬ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পেয়েছিলেন। তিনি আজ প্রয়াত হলেও তাঁর যোগ্য উত্তরসূরীরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। তবে লক্ষ্মণের খুব আক্ষেপ নতুন প্রজন্ম তাদের বাপ-ঠাকুরদার মতো এই শিল্পকে খুব বেশি মন বা হৃদয়ে ঠাঁই দিচ্ছে না। ‘সবাই এখন ঐতিহ্য নয়, টাকার পিছনে ছোটে, বুঝলেন তো।’ লক্ষ্মণের গলার স্পষ্ট আক্ষেপ ধরা পড়েছিল সৌমাল্যর বক্তব্যে। মাটির সুর বিপন্ন।

রঙের বৈভবের সাথে নজরকাড়া ডিজাইন নতুনগ্রামের কারিগরদের তৈরি কাঠের পুতুলের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। পুতুলের রূপ দেওয়া হয় এক টুকরো চোঙাকৃতি কাঠের খণ্ড থেকে। বাড়ির স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে পুতুল তৈরিতে সাহায্য করেন। পুরুষরা প্রথমে বেশ শক্তি কাজে লাগিয়ে বাটালি বা ছেনি-হাতুড়ি দিয়ে পাথরের উপর মূর্তি খোদাই করেন। তারপর গালা স্পিরিট এবং কাঠের ন্যাচারাল রং মিশিয়ে পালিশ করেন। মূর্তিগুলি নানান আকৃতির হয়। পাঁচ ইঞ্চির পুতুল থেকে চার ফুটের পুতুল সবরকমই বানানো হয়। শেষে সূক্ষ্মহাতে তুলির টান দেন মহিলারা। এমন কি বাড়ির ক্ষুদে সদস্যস্যদের হাতেও থাকে তুলি। এক বিশালাকৃতি বার্নিশ রং করা সপরিবার দুগগাঠাকুর একজনের উঠোনে শুকাতে দেখে সুতনুকা আগ্রহ ভরে খোঁজ নেয়। তার গন্তব্য নাকি বিলেত….মোটা টাকা অগ্রীমের বিনিময়ে ব্রিটেনের এক ব্যবসায়ী এটি অর্ডার দিয়েছেন।

তবে পুতুলের চাহিদার দিক দিয়ে প্রথমেই উঠে আসে পেঁচা।দুই ধরণের প্যাঁচা তৈরি হয় এখানে। একটি ডানা ছাড়া, অন্যটি দু’ধারে সামান্য মাটি ধরিয়ে ডানাযুক্ত। লক্ষ্মীর প্রতীক শ্বেতপ্যাঁচা। বছরে একাধিকবার এই লক্ষ্মীপেঁচার পুজো হয়….ভাদ্র, পৌষ ও চৈত্র মাসে। এইসব পুজোর কারণে ত্রিবেণী,খাগড়া, দক্ষিণেশ্বর, কালিঘাট,বড়বাজার প্রভৃতি অঞ্চল থেকে ক্রেতারা পাইকারি মূল্যে পেঁচাগুলি কিনে নিয়ে যান। পেঁচার নানা ধরণের ডিজাইন। পেঁচার গায়ে সাদা রঙের পোচের উপর লাল, সবুজ, হলুদ ও কালো রঙের অনন্য টান। বিমূর্ত মূর্তি কণায় কণায় প্রাণ পায় যেন। এখানকার ঐতিহ্যবাহী সব পুতুলের নক্সার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পটচিত্রের কথকতা, পুরাণ ও গ্রাম্যজীবনগাথার উপাদান।
লক্ষ্মণ নাকি খুব দু:খ করেছে যে এখানকার কোন পাইকারি বাজার নেই। তবে বাংলা নাটক ডট কম এর উদ্যোগে এখানে জানুয়ারি মাসে একটি মেলা হয় যেখানে বাইরে থেকে অনেক লোকজন আসেন। কেনা-বেচাও ভালোই হয়। এছাড়াও এই পুতুল যায় নবদ্বীপ-শান্তিপুরের রাসমেলায় কিংবা শ্রীখন্ড, মাটিয়ারির মেলায়। এই মেলাগুলিতে মূলত চাহিদা গৌর-নিতাই এর পুতুলের। পঞ্চদশ ও ষোড়শ শতকের ভক্তি আন্দোলনের প্রভাব হিসেবে গৌর-নিতাই পুতুলের উদ্ভব হয়।
পুতুল ছাড়াও এখন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এখানকার শিল্পীরা তৈরি করছেন নানা আসবাবপত্র। গ্রামের মধ্যেই তৈরি হয়েছে লোকশিল্পের একটি হাব। প্রযত্নে ইউনেস্কো এবং রাজ্য সরকারের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প দপ্তর। সেখানে বেশ কিছু আসবাবপত্র রাখা থাকে। কোন চেয়ারের হাতলে কাঠের প্যাঁচা, আবার কোনটার পায়ায় রাজা-রানির কাঠমূর্তি। দরজার পাল্লায় দুর্গার মোটিফ। বুকশেল্ফের গায়ে গণেশ-জননীর কড়া দৃষ্টি। কাঠের প্যাঁচা, রাজা-রানি এগুলি ব্যবহার করা হচ্ছে দরজার ফ্রেম, ডাইনিং টেবল, সোফা সেট, সেন্টার টেবল, আয়না এমন কি খাটেও। এই সব শিল্পীদের হাতের ছোঁয়ায় বদলে গেছে চিরাচরিত কাঠের আসবাবপত্রের ধ্যানধারণ।
গ্রামেরই এক ২৪ বছরের শিল্পী গৃহবধূ ওদের জানিয়েছেন যে মেলা বা অন্যান্য উৎসবের সময়ে অথবা শীতের মরসুমে ভগবানের দয়ায় তাদের উপার্জন কম হয় না, বেশিরভাগই বড় অর্ডারের দৌলতে। কাঠ তৈরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে পুতুল তৈরীর পদ্ধতিতে ১ দিনের বেশি সময় লাগে না। দক্ষ হাতে এইসব শিল্পীরা ২৪ ঘন্টারও কম সময়ে ২০০র ও বেশি পুতুল বানিয়ে ফেলতে পারেন। এই শিল্পীরা মূলত ভাস্কর বা সূত্রধর উপাধিপ্রাপ্ত হন।
লক্ষ্মণ সুতনুকাকে বলেছে ‘জানেন দিদি, আমাদের বাবা-ঠাকুরদারা আমাদের বেশি লেখাপড়া শেখাননি। যেটুকু এই শিল্প ধরে রাখার জন্য দরকার সেটুকুই শিখিয়েছিলেন। তাই আমরা এই পুতুলের ঐতিহ্যকে নিয়ে চলেছি বয়ে। কিন্তু যুগের হাওয়ার সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের স্বপ্ন এখন আকাশছোঁয়া ছেলেমেয়েদের নিয়ে। আমরা নিজেরা না খেয়ে থেকেও তাদের পড়াশোনা শেখাচ্ছি। বড় হয়ে তারা শহরের কলেজেও যাচ্ছে। কিন্তু পুতুলদের ভালবাসছে না। আমাদেরই কর্মফল, দিদি বুঝলেন তো!” সম্রাট বুঝতে পারে, কারণ একই উপলব্ধি ওরও হয়৷
কিছু বছর আগেও তেমনভাবে প্রচারের আলোয় ছিল না এই গ্রাম, মসৃণ ছিল না কাঠ পুতুলের গ্রাম যাওয়ার পথ। তবে বর্তমানে জেলা প্রশাসন ও বিভিন্ন সংস্থার উদ্যোগে নতুনগ্রাম এখন অনেকাংশেই মানুষের কাছে পরিচিত।
একসময় দিল্লির দরবারে হাজির হয় বাংলার এই লোক-শিল্পের নমুনা। রাষ্ট্রপতির বিচারে অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পনিদর্শন হিসাবে পুরস্কৃত হয় তা। ১৯৬৬ সালে ডঃ সর্বপল্লী রাধাকৃষণ পুরস্কৃত করেন শম্ভুনাথ ভাস্করকে।

নতুনগ্রামের আনাচে কানাচে কাঠের পুতুলরা প্রাণ পায়, কথা বলে রাধাকৃষ্ণ, লক্ষ্মী প্যাঁচা, গণেশ, দূর্গা বা মুখোশ দম্পতি। বাংলা নাটক ডট কমের উদ্যোগে এদের এখানে মেলা হয়, কিছু হাতের কাজ পাড়ি দেয় সাগরপাড়ে। সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, সৃষ্টিশীল গ্রাম। তবে মাটির সুরের তাল কাটছে দেখে কেমন যেন একটা অন্ধকার নেমে আসছে মনে হল সম্রাটের।

কখন যে সন্ধ্যে গড়িয়েছে রাতের দিকে সম্রাট বুঝতেই পারে নি। সুদেষ্ণা যাতায়াত কমিয়ে দেওয়ার পর গেস্টদের নিয়েই থাকে মূলত সে। বাবা এখানে আর আসেন না তেমন। যে বাড়ির ইঁট কাঠের প্রতিটি নিঃশ্বাসের খবর বাবা রাখতেন সেই বাবা আজ ‘শান্তিনিকেতন’ সম্পর্কে সম্পূর্ণ উদাসীন। দিঠিও ফটো তোলা ছাড়া খুব ওয়াকিবহাল নয় এই গ্রাম নিয়ে। লক্ষ্মণের নতুন গ্রাম নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মের উদাসীনতার আক্ষেপের কালো মেঘ যেন সম্রাটকেও একই ভাবে গ্রাস করতে থাকে। ধীর পায়ে রান্নাঘরের দিকে যায় সে…..অতিথিহীন ঘরগুলি পায়ে পায়ে পেরিয়ে।
ভালো লাগলে শেয়ার করুন

Leave a Reply